নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজধানীর ডেমরা (মাতুয়াইল) ভূমি অফিসে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া এক ঘটনাকে ঘিরে প্রশাসনিক নিরাপত্তা, সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও সাংবাদিকতার নৈতিক অবস্থান নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে কিছু ব্যক্তি সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে ভূমি অফিসে প্রবেশ করেন, সেবাগ্রহীতাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেন এবং কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়ানোর চেষ্টা করেন।
ঘটনার পর শ্যামপুর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) দায়ের করা হয়েছে, যা এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সকাল ১১টা ৩৪ মিনিটে কয়েকজন ব্যক্তি ক্যামেরা ও মাইক্রোফোনসহ ডেমরা (মাতুয়াইল) ভূমি অফিসে প্রবেশ করেন। নিজেদের ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিয়ে তারা অফিসের ভেতরে প্রবেশ করে সেবাগ্রহীতাদের ‘দালাল’ আখ্যা দিয়ে অশোভন আচরণ ও মন্তব্য করতে থাকেন। এতে অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হয় এবং আতঙ্কে অনেক সেবাগ্রহীতা কাজ অসমাপ্ত রেখেই চলে যান। অফিস সূত্র জানিয়েছে, ঘটনার পুরো ভিডিও ফুটেজ সিসিটিভিতে সংরক্ষিত আছে।
পরে ২২ ও ২৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে একই ধরণের প্রায় ৮-১০ জন ব্যক্তি আবারও অফিসে আসেন। ভূমি অফিস সূত্রে জানা যায়, তারা বিভিন্ন গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে নিজেদের প্রতিনিধি হিসেবে পরিচয় দেন।
নাম পাওয়া গেছে মোঃ তোফায়েল হোসেন (টুটুল), স্টাফ রিপোর্টার, বিজয় টিভি, মোঃ ইদ্রিসুর রহমান হৃদয়, ক্যামেরা পার্সন, আনন্দ টিভি,মোঃ মনির হোসেন, রিপোর্টার, আনন্দ টিভি। এছাড়া আরও কয়েকজন বিভিন্ন টেলিভিশন ও অনলাইন গণমাধ্যমের নাম ব্যবহার করে অফিসের কর্মকর্তা ও সেবাগ্রহীতাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, অনৈতিক দাবি ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ আছে। ভূমি অফিসের সহকারী কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান বলেন, ২০ থেকে ২৫ ফেব্রুয়ারির মধ্যে অজ্ঞাত নম্বর থেকে ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপ কলের মাধ্যমে হুমকি এবং অনৈতিক প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি শ্যামপুর থানায় জিডি (নং–১১৭৫) করেছি।”
তিনি আরও জানান, অভিযুক্তদের কাছে সংবাদ সংগ্রহ বা অনুসন্ধানের কোনো বৈধ অ্যাসাইনমেন্ট বা অনুমতিপত্র চাওয়া হলে তারা কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি। ডেমরা (মাতুয়াইল) ভূমি অফিস প্রতিদিন শত শত নাগরিককে সেবা দেয়। জমির মালিকানা যাচাই, নামজারি ও খাজনা পরিশোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজ এখানেই সম্পন্ন হয়। এমন অফিসে অনুমতি ছাড়া বহিরাগতদের প্রবেশ শুধু সেবাগ্রহীতা নয়, কর্মকর্তাদের জন্যও নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করে। তিনি আরও বলেন, দালালবিরোধী অভিযান হোক, তা প্রশাসন করবে এবং গণমাধ্যমকর্মীদের অবশ্যই ভূমিকা থাকবে আমরা তাকে সাধুবাদ জানাই । কিন্তু সাংবাদিক পরিচয়ে এসে অফিসের ভেতরে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা দায়িত্বজ্ঞানহীনতা ছাড়া কিছু নয়। সাংবাদিকতা সমাজের চতুর্থ স্তম্ভ। এর শক্তি হলো বিশ্বাসযোগ্যতা ও নিরপেক্ষতা। কিন্তু যখন কেউ এই পরিচয়কে ভয়ভীতি বা প্রভাবের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় পুরো গণমাধ্যম এবং সাধারণ জনগণ।
গণমাধ্যম বিশ্লেষকরা বলছেন সাংবাদিকতা কখনো ‘অধিকার’ নয়, বরং এটি এক ‘দায়িত্ব’। সংবাদ সংগ্রহের নামে সরকারি কাজে বাধা বা ভয় দেখানো গণমাধ্যমের নীতিবিরোধী।
এক প্রবীণ সাংবাদিক এহতেশামুল হক মন্তব্য করেন, ভুয়া পরিচয়ে এমন আচরণ শুধু প্রশাসন নয়, প্রকৃত সাংবাদিকদেরও বিব্রত করে। এটি পেশার মর্যাদা নষ্ট করছে। বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ১৮৬ ও ১৮৮ ধারায় সরকারি কাজে বাধা দেওয়া একটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাছাড়া ভুয়া পরিচয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং দণ্ডবিধির প্রতারণা সংক্রান্ত ধারা প্রযোজ্য হতে পারে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, জিডি দায়েরের পর তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব।
তিনি আরও যোগ করেন, ডেমরা (মাতুয়াইল) ভূমি অফিসের ঘটনা কেবল একটি অফিসের সমস্যা নয়; এটি গোটা প্রশাসনিক সংস্কৃতি ও সাংবাদিকতা পেশার জন্য এক সতর্কবার্তা। এটি মনে করিয়ে দেয় যখন ভুয়া পরিচয় ও অনৈতিক উদ্দেশ্য সাংবাদিকতার মুখোশ পরে আসে, তখন সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনগণের আস্থার। তাই প্রয়োজন, গণমাধ্যমে পেশাগত নিবন্ধন, মাঠ পর্যায়ে পরিচয় যাচাই, এবং প্রশাসনিক নিরাপত্তা জোরদার করা।যতদিন এসব বাস্তবায়ন না হবে, ততদিন এমন ‘পরিচয়ের অপব্যবহার’ সরকারি সেবা ও গণমাধ্যম দুই ক্ষেত্রেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে।