
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের অনুমতি দিয়েছে দেশটির কেন্দ্রীয় সরকার। প্রদেশে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির পর নিরাপত্তা জোরদারে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে প্রাদেশিক রাজধানী পেশোয়ারের বিভিন্ন সড়ক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বন্ধ রয়েছে ল্যান্ডফোন ও ডিএসএলসহ বিভিন্ন টেলিযোগাযোগ সেবা।
রোববার (১১ অক্টোবর) পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সেনা মোতায়েনের অনুমতি দিয়ে একটি সরকারি আদেশ জারি করে। দেশটির সংবাদমাধ্যম দ্য ডন জানিয়েছে, সরকারি আদেশ অনুযায়ী, নাগরিকদের জানমাল ও সরকারি স্থাপনার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বেসামরিক প্রশাসনকে সহায়তা করবে সেনাবাহিনী।
আদেশে বলা হয়েছে, জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসনসংক্রান্ত ঘোষণার কার্যকারিতা যত দিন থাকবে, তত দিন সেনা মোতায়েনের অনুমোদন বহাল থাকবে। সংবিধানের ২৪৫ অনুচ্ছেদে দেওয়া ক্ষমতাবলে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। খাইবার পাখতুনখাওয়ার গভর্নর ফয়সাল করিম কুন্দি সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রয়োজনীয় সেনাসদস্য ও সামরিক সরঞ্জামের সংখ্যা নির্ধারণ করবেন।
এর আগে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার সুপারিশে প্রেসিডেন্টের অনুমোদনের পর প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করা হয়। সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের আওতায় এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রেসিডেন্ট হাউসের বিবৃতিতে জানানো হয়।
জরুরি অবস্থা জারির পর পেশোয়ারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়কে পণ্যবাহী কনটেইনার বসিয়ে যান চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পেশোয়ার রেলস্টেশনের কাছে কনটেইনার বসিয়ে খাইবার বাজার, শোবা বাজার ও আশপাশের এলাকায় চলাচলের পথ বন্ধ করা হয়েছে। এডওয়ার্ডস কলেজের কাছেও কনটেইনার বসানো হয়েছে, যার ফলে জেল রোড ও মালিক সাদ শহীদ ফ্লাইওভারে প্রবেশের পথ বন্ধ হয়ে গেছে।
বালা হিসার দুর্গের কাছে এবং পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারলাইনসের কার্যালয়ের বাইরেও কনটেইনার বসানো হয়েছে। এতে মল রোডে প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়েছে। গভর্নর হাউসের আশপাশে বিপুলসংখ্যক পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। এ জন্য অন্যান্য জেলা থেকেও পুলিশ সদস্যদের আনা হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য ডন।
গভর্নর হাউস থেকে মুখ্যমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে যাওয়ার পথে শুধু সরকারি যানবাহন চলাচলের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। রয়্যাল আর্টিলারি (আরএ) বাজারও বন্ধ রাখা হয়েছে। তবে সদর এলাকার কিছু অংশে যান চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে।
শহরের প্রধান সড়ক খাইবার রোড বন্ধ করে দেওয়ায় বিকল্প সড়কগুলোতে যানবাহনের চাপ বেড়েছে। খাইবার রোড পেশোয়ারের জিটি রোডের সঙ্গে ইউনিভার্সিটি রোডের পূর্বাংশের সংযোগ স্থাপন করেছে। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়কের আশপাশে সেনানিবাস ও রেড জোন এলাকায় কোর কমান্ডারের বাসভবন, বেসামরিক সচিবালয়, কেন্দ্রীয় পুলিশ কার্যালয়, মুখ্যমন্ত্রীর সচিবালয় ও বাসভবন এবং গভর্নর হাউসসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রয়েছে।
এদিকে পেশোয়ারে ল্যান্ডফোন ও ডিএসএলসহ সব ধরনের টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধ থাকার খবর পাওয়া গেছে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পাকিস্তান মুসলিম লীগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) নেতৃত্বাধীন। অন্যদিকে খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সরকার পরিচালনা করছে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)। বিভিন্ন বিষয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ চলছে। সন্ত্রাসবাদ দমনের নীতি এ বিরোধের অন্যতম প্রধান কারণ। গত ৩ অক্টোবর দুই পক্ষের মধ্যে চলমান আলোচনা ভেঙে পড়ে।
পিটিআইয়ের অভিযোগ, প্রদেশের নিরাপত্তাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের উপেক্ষা করা হচ্ছে। তবে কেন্দ্রীয় সরকার এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে। পিটিআই সন্ত্রাসবাদ দমনের নীতি পর্যালোচনার দাবি জানিয়ে আসছে এবং সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করছে।
অন্যদিকে, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের উদ্যোগের সমালোচনা করে আসছে কেন্দ্রীয় সরকার। আফগান তালেবানের সঙ্গে সংলাপের বিষয়ে প্রাদেশিক সরকারের অবস্থান নিয়েও কেন্দ্রের আপত্তি রয়েছে।
দ্য ডন জানায়, জরুরি অবস্থা জারির এক দিন আগে প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলি জারদারির বৈঠক হয়। বৈঠকে দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। কেন্দ্র ও প্রাদেশিক সরকারের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে বিরোধী দলগুলোর সংবাদ সম্মেলন আয়োজন নিয়েও জটিলতা তৈরি হয়েছে। বিরোধী জোট সাধারণত খাইবার পাখতুনখাওয়া হাউসে সংবাদ সম্মেলন করে থাকে। কিন্তু ভবনটি সিলগালা করে দেওয়ায় বিকল্প স্থান খুঁজতে সমস্যায় পড়েছে তারা।
তেহরিক-ই-তাহাফুজ-ই-আইন-ই-পাকিস্তান (টিটিএপি) শেষ পর্যন্ত মুরি এক্সপ্রেসওয়ের কাছে ভারা কাহু এলাকায় জামিয়া আল উইলায়ায় সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জোটটির মুখপাত্র আখুনজাদা হুসাইন আহমেদ ইউসুফজাই জানান, প্রথমে তারা খাইবার পাখতুনখাওয়া হাউসে সংবাদ সম্মেলন করার কথা ভেবেছিলেন। পরে ভবনটি সিলগালা থাকার বিষয়টি জানতে পারেন। এরপর ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত ফি দিতে রাজি থাকার পরও কর্তৃপক্ষ অনুমতি দেয়নি। পরে ভারা কাহুতে সংবাদ সম্মেলন করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এর আগে শনিবার খাইবার পাখতুনখাওয়ার পুলিশপ্রধান জুলফিকার হামিদ সম্ভাব্য সহিংস বিক্ষোভ ও নাশকতার আশঙ্কায় জেলা পুলিশকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে বলপ্রয়োগের ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।