অজয় দাশ গুপ্ত:
শারদীয় দুর্গাপূজা আমাদের দেশের এক বড় উৎসব। ঈদ, বাংলা নববর্ষের পর এমন জাঁকজমকপূর্ণ উৎসব আর একটিও নেই। আমার কাছে সবচেয়ে বেশি আশ্চর্যের মনে হয়, শক্তিময়ী দুর্গার আরাধনার পরও আমাদের জাতিসত্তার ভেতরে শক্তির বড় অভাব। এই অভাবের কারণগুলো এখন খতিয়ে দেখার সময় এসেছে। সকাল থেকে রাত পাঁচদিন ধরে ধ্যান, পূজা, আরতি আর আনন্দে মত্ত থাকলেই আমাদের সমস্যা দূর হবে না। পরিষ্কার করে বলতে চাই যে, অস্তিত্ব আর বাঁচার জন্য পূজার সঙ্গে সামাজিকতা আর সমাজের যোগ ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে তুলতে হবে। চোখ খুলে তাকালেই দেখা যায়, যারা তা করতে পেরেছেন তারা সফল। কোনো দেশ বা জাতিতে মাইনরিটি বলে তাদের কোনো দুর্ভোগ পোহায় না। আর তা হলেও উত্তরণের পথ জানে তারা।
অনেকে বলে থাকেন, আমি নিজেও মনে করতাম গান্ধীবাদী হিন্দুত্বই আসল কথা। এখন আর তা মনে হয় না। স্বয়ং গান্ধী লিখেছেন, তার জীবনের যে কোনো হতাশ-মুহূর্তে গীতার যে কোনো শ্লোক পড়লেই তার মুখ থেকে উদ্বেগের সব রেখা মুছে গিয়ে আশার রেখা ভেসে উঠত। এই গীতা কীভাবে এলো? মহাভারতের যুদ্ধে কুরুক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণের বাণীই গীতা। যে বাণীতে তিনি ‘স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ’ জানিয়েছেন। যে যুদ্ধে বারবার অপারগতা জানানো অর্জুনের হাতে গাণ্ডীব তুলে দিয়েছেন। যুদ্ধ থেকে চলে যাওয়ার জন্য ব্যগ্র সখাকে বুঝিয়ে আবার ময়দানে এনেছেন। যার সারকথা ছিল, বিনাযুদ্ধে শান্তি আসবে না। শান্তি আসে আত্মত্যাগে আসে মানুষের অবদানে, যার প্রমাণ আমাদের সমাজ, আমাদের দেশ।
তবে কী আমরা যুদ্ধের জন্য আগ্রহী হওয়ার কথা বলছি? না। আমরা ন্যায্যতার কথা বলছি, অস্তিত্বের কথা বলছি, শান্তিতে বাঁচার কথা বলছি। এই বাঁচার জন্যই পূজার প্রয়োজন।
বাঙালির বড় সৌভাগ্য যে, তারা সংস্কৃতি আর পূজাকে এক করে নিতে পেরেছে। মূলত সংস্কৃতিই পূজাকে নিয়ন্ত্রণ করে। শঙ্খ থেকে বাদ্য, বাদ্য থেকে গান সব মিলিয়ে যে জাঁকজমক পূজা, তাকে শুধু ভক্তিরসে ভাসানোর কাল এখন আর নেই। সামনে দুটি কর্তব্য আমাদের নতুন প্রজন্মকে পাঠদান করা এবং নিজের ধর্ম বিষয়ে অবগত করানো। যারা অতি আধুনিক হওয়ার নামে তা করেন না, তারা শিকড়হীন। শিকড় ছাড়া কোনো গাছ বাঁচে না, বাঁচতে পারে না। তাই আমাদের শিকড়ে যেতেই হবে। আজ আর অন্য কোনো পথ খোলা নেই আমাদের সামনে।
বিদেশের বাঙালির দায় আরও বেশি। তারা বাস করেন নিরাপদ গণতান্ত্রিক ভূমিতে। তার জীবনে সচ্ছলতা বা আনন্দের পাশাপাশি আছে নিরাপত্তা। যিনি নিরাপদ, যিনি নিজে জানেন তিনি ভয়হীন, তিনি কেন তার আরেক আত্মীয়র জন্য তা নিশ্চিত করবেন না? এমন ভাবনাই আমাদের লালন করতে হবে।
আমরা জানি, সংকীর্ণতা আর স্বার্থপরতায় কতটা পটু বাঙালি হিন্দু। এখন তা পরিহারের সময় সমাগত। আপনি একা ভালো থাকতে পারবেন না। আপনার সংঘবদ্ধ জীবনে যাদের দরকার, তাদেরও ভালো রাখতে হবে। এই ভালো লাগা দেশ-কাল-সীমানার গণ্ডি পেরিয়ে সবাইকে নিয়ে ভালো থাকা। আপনার আত্মীয়-পরিজন খারাপ থাকলে আপনি কীভাবে ভালো থাকবেন? এসব কথা মাথায় রেখে ঐক্যবদ্ধভাবে পূজার আয়োজন আর কল্যাণের পথে আসুন।
মা দুর্গা যে অসুরকে বধ করেছিলেন, তার প্রতীক আমাদের চোখের সামনেই আছে। আমাদের সমাজ ও বাস্তবতায় এর চেয়েও বড় অসুর আছে, যারা সব গিলে খাচ্ছে। হয়তো ভবিষ্যতেও তারা খাবে। দুর্গা নিশ্চয় মূর্তি থেকে বেরিয়ে এসে সাহায্য করবেন না। তিনি আমাদের যে অভয় দিয়েছেন বা দেবেন, যে সাহস দেবেন, যে শৌর্য দেবেন, তাতেই শক্তি। তা পুঁজি করে এগোলে দুর্গাপূজার সার্থকতা হবে শতভাগ। দুর্গাপূজার আরেক নাম শারদীয় দুর্গোৎসব। এবারের শারদীয় পূজা আমার কাছে এক জ্বলন্ত সাহসের ঠিকানা। এ ঠিকানায় মুক্তি আসুক আপামর বাঙালির।