
নিজস্ব প্রতিবেদক
সরকার নির্ধারিত দামেও মিলছে না তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)। বাজারে সরবরাহ সংকটের কারণে অতিরিক্ত দামে বিক্রি হচ্ছে রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৮৩৭ টাকা হলেও গ্রাহকদের কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়।
শনিবার (১০ অক্টোবর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে। রাজধানী ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন গ্রাহক ও বিক্রেতারা।
রাজধানীর হাতিরপুলের এক গ্রাহক জানান, গত ২ অক্টোবর ডেলিভারি চার্জসহ ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার কিনতে তাকে ২ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়েছে। ওই সময় সরকার নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। বিক্রেতার দাবি, সরবরাহ সংকটের কারণে বেশি দামে সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে, ফলে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে।
মিরপুরেও ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। মুন্সীগঞ্জের এক বিক্রেতা জানান, সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখের পর থেকে তিনি নতুন করে গ্যাস সরবরাহ পাননি। নতুন সিলিন্ডার পাওয়া গেলেও দাম বেশি পড়বে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বিইআরসির নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ী, ১২ কেজির সিলিন্ডার অপারেটর কোম্পানি থেকে ডিলার পর্যায়ে বিক্রির দাম ১ হাজার ৭৪২ টাকা। ডিলারের মুনাফা ৫০ টাকা ও খুচরা বিক্রেতার মুনাফা ৪০ টাকা ধরে গ্রাহক পর্যায়ে দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা।
তবে ডিলার পর্যায়েই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি অর্থ চাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মুন্সীগঞ্জের এক ডিলারের দাবি, অপারেটর তার কাছে প্রতি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৯৯০ টাকা চেয়েছে, যেখানে নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৭৪২ টাকা।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমিতিও অপারেটর পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগ তুলে বিইআরসিকে চিঠি দিয়েছে। সমিতির তথ্য অনুযায়ী, নতুন মূল্য নির্ধারণের পর বিভিন্ন অপারেটর ডিলারদের প্রতি সিলিন্ডার ১ হাজার ৭৪০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত দামে সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে।
সমিতির সভাপতি মো. সেলিম খানের দাবি, অপারেটরদের বাড়তি দাম ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ডিলারদের পক্ষে নির্ধারিত মূল্যে গ্যাস বিক্রি করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দেশে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। আগস্টে আমদানির পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন। আমদানির পরিমাণ প্রায় কাছাকাছি থাকলেও বাজারে সরবরাহ সংকট তৈরি হওয়ায় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
আমদানিকারক ও অপারেটরদের কেউ কেউ আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, পরিবহন ব্যয় এবং প্রিমিয়াম বেড়ে যাওয়াকে সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। আবার অন্য অপারেটরদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করা প্রতিষ্ঠানগুলোও পর্যাপ্ত সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগ করেছে।
গ্রিন এলপিজির জিএম আহসান হাবিব হিরোর ভাষ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে তাদের দুই হাজার টন চাহিদার বিপরীতে মাত্র ১৫০ টন গ্যাস পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে, এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক দাবি করেছেন, আমদানির কোটা, লাইসেন্সসংক্রান্ত অনুমোদন এবং দীর্ঘমেয়াদি আমদানি চুক্তির সীমাবদ্ধতার কারণে সরবরাহ ব্যবস্থায় জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
তবে বাজারে সরবরাহ ঘাটতির প্রকৃত কারণ এবং কোথাও মজুত করে বাড়তি মুনাফা করা হচ্ছে কি না, তা এখনো নিশ্চিতভাবে নিষ্পত্তি হয়নি।
এলপিজির নির্ধারিত দাম কার্যকর করতে জ্বালানি মন্ত্রণালয় দেশের জেলা প্রশাসকদের নির্দেশনা দিয়েছে। জেলা প্রশাসকেরা ডিলারদের সঙ্গে আলোচনা করার পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করছেন।
বিইআরসিও জানিয়েছে, আমদানির তথ্য বিশ্লেষণ করে সংকটের কারণ অনুসন্ধানে কমিটি গঠন করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে পরিস্থিতি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংস্থাটি।
তবে সরবরাহ সংকট ও বিভিন্ন পর্যায়ে বাড়তি দাম নেওয়ার অভিযোগের মধ্যে ভোগান্তি কমেনি সাধারণ গ্রাহকের। সরকার নির্ধারিত মূল্য থাকা সত্ত্বেও বেশি দামে রান্নার গ্যাস কিনতে হওয়ায় কার্যকর বাজার নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।