
ধর্ম ডেস্ক:
উপহার আদান-প্রদান মানুষের মধ্যে পারস্পরিক ভালোবাসা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি বাড়ায়। দূরত্ব কমাতে এবং সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করতেও উপহারের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামে উপহার দেওয়া-নেওয়াকে উৎসাহিত করা হয়েছে। তবে উপহারের আড়ালে ঘুষ, সুদ কিংবা অন্যায় সুবিধা গ্রহণের সুযোগ নেই। একইভাবে সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য করে উপহার দেওয়াও ইসলামের ন্যায়বিচারের শিক্ষার পরিপন্থি।
রাসুলুল্লাহ (সা.) উপহার গ্রহণ করতেন এবং এর প্রতিদানও দিতেন। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) উপহার গ্রহণ করতেন এবং তার বিনিময়ে উপহার দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪১৪)
ইসলামি বিধান অনুযায়ী, বিশেষ কিছু পরিস্থিতিতে উপহার দেওয়া-নেওয়া নিষিদ্ধ বা অনুচিত। এমন চারটি বিষয় তুলে ধরা হলো।
কোনো সরকারি কর্মকর্তা বা দায়িত্বশীল ব্যক্তি তাঁর পদমর্যাদা কিংবা দায়িত্ব পালনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ব্যক্তিগত উপহার গ্রহণ করলে তা ঘুষ বা অবৈধ সুবিধার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। বিশেষ করে সরকারি অর্থ বা সম্পদ সংগ্রহের দায়িত্বে থেকে ব্যক্তিগতভাবে উপহার নেওয়ার বিষয়ে ইসলামে কঠোর সতর্কতা রয়েছে।
হজরত আবু হুমায়দ আস-সাঈদী (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) এক ব্যক্তিকে সদকা সংগ্রহের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। দায়িত্ব পালন শেষে ওই ব্যক্তি বললেন, এটি সরকারি সম্পদ, আর এটি তাঁকে উপহার দেওয়া হয়েছে। তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রশ্ন করেন, তিনি নিজের বাবা-মায়ের ঘরে বসে থাকলে কি এমন উপহার পেতেন?
এ ঘটনার মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (সা.) বুঝিয়ে দিয়েছেন, দায়িত্বের কারণে পাওয়া উপহারকে ব্যক্তিগত সৌজন্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪২৫—প্রদত্ত লেখায় উল্লেখিত নম্বর অনুযায়ী)
কারও উপকার করা, বিপদে পাশে দাঁড়ানো কিংবা ন্যায্য কাজে সুপারিশ করা প্রশংসনীয় কাজ। কিন্তু সেই উপকারের বিনিময়ে শর্তসাপেক্ষে উপহার গ্রহণ করা হলে তা অন্যায় সুবিধা বা অবৈধ লেনদেনের পর্যায়ে পড়তে পারে।
হজরত আবু উমামাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের জন্য সুপারিশ করার কারণে উপহার গ্রহণ করলে সে সুদের একটি দরজায় প্রবেশ করল। (সুনান আবু দাউদ, হাদিস: ৩৫৪১)
এ হাদিস থেকে বোঝা যায়, উপকারের বিনিময়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষত সরকারি কাজ, নিয়োগ, সেবা গ্রহণ কিংবা সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে উপহার দেওয়া-নেওয়া বৈধ নয়।
ইসলামে বিপদগ্রস্ত ব্যক্তিকে ঋণ দেওয়া একটি মহৎ কাজ। তবে ঋণ দেওয়ার শর্ত হিসেবে অতিরিক্ত অর্থ, উপহার কিংবা অন্য কোনো সুবিধা দাবি করা সুদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
হাদিসে ঋণদাতার পাওনা থাকা অবস্থায় ঋণগ্রহীতার কাছ থেকে বিশেষ সুবিধা গ্রহণের বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.)-এর একটি বর্ণনায় ঋণগ্রহীতার দেওয়া সামান্য উপহারও গ্রহণ না করার পরামর্শ পাওয়া যায়, যদি তা ঋণের কারণে দেওয়া হয়ে থাকে।
এ ছাড়া সুনান ইবনে মাজাহর একটি বর্ণনায় বলা হয়েছে, ঋণগ্রহীতা ঋণদাতাকে উপঢৌকন দিলে বা বিশেষ সুবিধা দিতে চাইলে তা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। তবে আগে থেকেই উভয়ের মধ্যে উপহার বিনিময়ের স্বাভাবিক রীতি থাকলে বিষয়টি ভিন্ন হতে পারে। (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৪৩২)
অর্থাৎ, ঋণের কারণে শর্তযুক্ত বা প্রত্যাশিত অতিরিক্ত সুবিধা গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে। তবে ঋণসংক্রান্ত সম্পর্কের বাইরে স্বাভাবিক সৌজন্যমূলক উপহারের বিধান পরিস্থিতি অনুযায়ী বিবেচ্য।
সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা বাবা-মায়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো গ্রহণযোগ্য কারণ ছাড়া একজন সন্তানকে বেশি সম্পদ বা দামি উপহার দিয়ে অন্য সন্তানদের বঞ্চিত করা ইসলামের ন্যায়নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
হজরত নু‘মান ইবনে বশীর (রা.) থেকে বর্ণিত, তাঁর বাবা তাঁকে বিশেষ কিছু সম্পদ দান করেছিলেন। এ বিষয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে সাক্ষী রাখার অনুরোধ করা হলে তিনি জিজ্ঞাসা করেন, অন্য সন্তানদেরও কি একই ধরনের দান করা হয়েছে? উত্তরে না বলা হলে তিনি বলেন, ‘আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।’ এরপর নু‘মান (রা.)-এর বাবা তাঁর দেওয়া দান প্রত্যাহার করে নেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৪১৬)
এ হাদিস থেকে শিক্ষা পাওয়া যায়, সন্তানদের মধ্যে উপহার দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়সংগত আচরণ করতে হবে। তবে প্রয়োজন, অসুস্থতা বা বিশেষ পরিস্থিতির কারণে কোনো সন্তানকে অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি আলাদা বিবেচনার দাবি রাখে।
ইসলামে উপহারের মূল উদ্দেশ্য হলো ভালোবাসা, আন্তরিকতা ও পারস্পরিক সম্পর্ক দৃঢ় করা। তাই উপহারের নামে ঘুষ গ্রহণ, ঋণের বিনিময়ে সুবিধা আদায় কিংবা অন্যায় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা উচিত নয়। একই সঙ্গে পরিবারে সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচার নিশ্চিত করাও জরুরি।
উপহার তখনই কল্যাণকর, যখন তা হয় আন্তরিকতা ও বৈধতার ভিত্তিতে—কোনো অন্যায় সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে নয়।