
নিজস্ব প্রতিবেদক:
জনগণের প্রত্যাশা ও অধিকার উপেক্ষা করে দেশ পরিচালনা করলে তার পরিণতি ভালো হবে না বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, যারা জনগণের মনের ভাষা বুঝতে ব্যর্থ হবেন, ইতিহাস তাদের ক্ষমা করবে না।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে জামায়াতে ইসলামী ঢাকা মহানগরী উত্তর আয়োজিত জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহের পেছনে ছিল একদলীয় শাসন, দমন-পীড়ন ও জনগণের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ। ১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশে গণতন্ত্রের পথ সংকুচিত করা হয়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা হরণ, বিরোধী মত দমন, দুর্নীতি ও বিচারহীনতার কারণে জনমনে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। ওই দিন সিপাহিরা বিপ্লব সংঘটিত করেন এবং সাধারণ মানুষ তাতে সংহতি প্রকাশ করে।
তিনি আরও বলেন, স্বাধীনতার ইতিহাস কোনো ব্যক্তি বা দলের একক সম্পত্তি নয়। মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন পর্যায়ে যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাঁদের যথাযথ স্বীকৃতি দিতে হবে। ইতিহাস নিয়ে কৃতিত্বের প্রতিযোগিতা না করে সবার অবদান স্বীকার করা উচিত।
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, নির্বাচনের আগে জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ২০টি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েও তিনি প্রশ্ন তোলেন।
বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয় ব্যক্তিদের নিয়োগের অভিযোগ করে তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা পরিষদ, সিটি করপোরেশন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে দলীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড আবারও কর্তৃত্ববাদী শাসনের পরিবেশ তৈরি করতে পারে।
বিরোধী দলের অবস্থান তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ন্যায়সংগত কাজে সরকারকে সহযোগিতা করা হবে, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে ন্যায়-অন্যায় বিবেচনা না করে কোনো সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। জনগণের অধিকার ও রাষ্ট্রীয় সংস্কারের প্রশ্নে সাত দফা দাবি নিয়ে তাঁদের আন্দোলন চলছে। এসব দাবি কোনো নির্দিষ্ট দলের নয়, বরং জনগণের দাবি।
র্যাবের নাম পরিবর্তন করে নতুন কাঠামো গঠনের উদ্যোগের সমালোচনা করে তিনি বলেন, শুধু নাম পরিবর্তন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। প্রয়োজনে আলোচনার মাধ্যমে দেশপ্রেমিক ও যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নতুন কাঠামো গঠন করতে হবে। সরকারি চাকরিতে দলীয় পরিচয়ের পরিবর্তে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে নিয়োগ নিশ্চিত করারও আহ্বান জানান তিনি।
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমির বলেন, ওই আন্দোলনের কৃতিত্ব কোনো একক দলের নয়, এটি ছিল জনগণের আন্দোলন। শহিদদের পরিবার এবং আহত ও পঙ্গুদের পাশে দাঁড়ানো সবার দায়িত্ব। গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। তাই দলীয়করণ, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জাতীয় স্বার্থবিরোধী কোনো চুক্তি বা সিদ্ধান্ত জনগণ মেনে নেবে না। আধিপত্যবাদের প্রভাবমুক্ত স্বাধীন রাষ্ট্র, ন্যায়বিচার এবং দুর্নীতি ও চাঁদাবাজিমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার আন্দোলন অব্যাহত থাকবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ৭ নভেম্বরকে শুধু সামরিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর পেছনে ছিল একদলীয় শাসন ও গণতন্ত্র হরণের বিরুদ্ধে জনমনের ক্ষোভ। অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে জনগণের ভোটাধিকার ও গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে সম্মান জানানোর আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে গণভোটের রায় ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা মহানগরী উত্তরের আমির মোহাম্মদ সেলিম উদ্দিন বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ছিল শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার। চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, বাজার সিন্ডিকেট ও দলীয়করণ বন্ধ না হলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। ন্যায়ভিত্তিক, জবাবদিহিমূলক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান তিনি।