
আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার দেড় টন ওজনের একটি মহাকাশ টেলিস্কোপ পৃথিবীর দিকে ধেয়ে আসছে। প্রায় ২২ বছর মহাকাশে থাকার পর আগামী ৪ নভেম্বর এটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে। তবে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় টেলিস্কোপটির অধিকাংশ অংশ পুড়ে গেলেও কিছু ধ্বংসাবশেষ ভূপৃষ্ঠে আছড়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
টেলিস্কোপটির নাম ‘নিল গেহরেলস সুইফট অবজারভেটরি’। ২০০৪ সালের ২০ নভেম্বর এটি মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়। শুরুতে এর নাম ছিল ‘সুইফট গামা-রে বার্স্ট এক্সপ্লোরার’। নাসার এই মহাকাশযানটি মূলত মহাবিশ্বের গামা-রে বিস্ফোরণ পর্যবেক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে।
নাসার তথ্য অনুযায়ী, ৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলীয় সময় ভোর ৩টা ৩০ মিনিটে, অর্থাৎ ভারতীয় সময় দুপুর ২টার দিকে এটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করতে পারে। তবে সময়ের এ হিসাব প্রায় ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত এদিক-সেদিক হতে পারে। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সময় টেলিস্কোপটির বেশির ভাগ অংশ পুড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে কিছু অংশ অক্ষত অবস্থায় পৃথিবীতে পৌঁছাতে পারে।
নাসার মিশনের প্রধান বিজ্ঞানী ব্র্যাড সেনকো মার্কিন বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) জানিয়েছেন, সম্ভাব্য পতন এলাকার মধ্যে রয়েছে আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, ভারত, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অঞ্চল।
নাসার হিসাব অনুযায়ী, টেলিস্কোপটির সম্ভাব্য পতন অঞ্চল দক্ষিণ অক্ষাংশের ২০ দশমিক ৬ ডিগ্রি থেকে উত্তর অক্ষাংশের ২০ দশমিক ৬ ডিগ্রির মধ্যে বিস্তৃত। পৃথিবীর মাঝামাঝি অংশজুড়ে এই অঞ্চলটি একটি বলয় তৈরি করেছে।
ভারতের ক্ষেত্রে পশ্চিম উপকূলের দামান থেকে পূর্ব উপকূলের ওডিশার কটক পর্যন্ত বিস্তৃত একটি কাল্পনিক রেখার দক্ষিণের এলাকাগুলো সম্ভাব্য অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে মুম্বাই, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু ও চেন্নাই রয়েছে। তবে দিল্লি, কলকাতা ও উত্তর ভারতের বড় একটি অংশ এই বলয়ের বাইরে।
তবে সম্ভাব্য অক্ষাংশের মধ্যে থাকা মানেই কোনো শহরে টেলিস্কোপটির ধ্বংসাবশেষ পড়বে, এমন নয়। বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের মুহূর্তে মহাকাশযানটি পৃথিবীর ঠিক কোন অবস্থানে থাকবে, তার ওপর প্রকৃত পতনস্থল নির্ভর করবে।
মহাকাশ থেকে নেমে আসা বস্তু পর্যবেক্ষণে ভারতের নিজস্ব সক্ষমতা রয়েছে। শ্রীহরিকোটায় অবস্থিত ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থার (ইসরো) মাল্টি-অবজেক্ট ট্র্যাকিং রাডার (এমওটিআর) বিভিন্ন মহাকাশবস্তু ও কৃত্রিম উপগ্রহের গতিপথ শনাক্ত এবং অনুসরণ করতে পারে। তবে সুইফট অবজারভেটরিটিকে ইসরো পর্যবেক্ষণ করছে কি না, সে বিষয়ে সংস্থাটির পক্ষ থেকে কিছু জানানো হয়নি।
জ্যোতির্পদার্থবিদ ও ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক অধ্যাপক জোনাথন ম্যাকডাওয়েলের ধারণা, টেলিস্কোপটির ধ্বংসাবশেষের বড় অংশ মহাসাগরে পড়তে পারে। তাঁর মতে, দেড় হাজার কেজি ওজনের এই মহাকাশযানের মাত্র ১০০ কেজি উপাদানও বায়ুমণ্ডল পেরিয়ে টিকে থাকলে তা হবে বিস্ময়কর।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির জ্যোতির্পদার্থবিদ ব্র্যাড টাকারও জানিয়েছেন, পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশই মহাসাগর হওয়ায় মহাকাশযানটির সমুদ্রে পড়ার সম্ভাবনা বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর কোনো অংশ স্থলভাগে পড়লেও অবকাঠামোর ক্ষতি কিংবা মানুষের আহত হওয়ার আশঙ্কা অত্যন্ত কম।
টেলিস্কোপটির পতন ঠেকাতে নাসার প্রচেষ্টা সফল হয়নি। প্রাথমিকভাবে মাত্র দুই বছরের মিশন হিসেবে পরিকল্পনা করা হলেও প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সময় ধরে কাজ করেছে এটি। দীর্ঘ ২২ বছরের অভিযানে দুই হাজারের বেশি গামা-রে বিস্ফোরণ এবং প্রায় এক হাজার ৪০০টি সুপারনোভা পর্যবেক্ষণ করেছে সুইফট অবজারভেটরি।
সূত্র: এনডিটিভি, এপি ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম।