
নিজস্ব প্রতিবেদক:
রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশের পর জামায়াতে ইসলামীর দেওয়া বক্তব্যের জবাব দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটি বলেছে, নারীদের জন্য পৃথক কমিটি গঠন করে দলের সর্বস্তরে তাদের অন্তর্ভুক্তির দাবি করা ‘শুভংকরের ফাঁকি’। পৃথক কমিটিতে নারীদের সীমাবদ্ধ রেখে প্রকৃত প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) এক বিবৃতিতে এ কথা জানায় টিআইবি। রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিয়ে প্রকাশিত গবেষণাকে ‘অসত্য’ ও ‘বিভ্রান্তিমূলক’ আখ্যা দিয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের দেওয়া বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে এ বিবৃতি দেয় সংস্থাটি।
টিআইবির দাবি, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। এমনকি আমির, নায়েবে আমির, সেক্রেটারি জেনারেল ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও নারীদের অন্তর্ভুক্তির চর্চা নেই। এ অবস্থায় জামায়াতের বক্তব্যকে ‘সত্যের অপলাপ’ বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।
গত রোববার ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করে টিআইবি। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্বসহ প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই।
এর প্রতিবাদ জানিয়ে সোমবার দেওয়া বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার গবেষণার তথ্যকে ‘অসত্য ও বিভ্রান্তিকর’ দাবি করেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সংগঠনের সব স্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা করে এবং নারীদের জন্য বিভিন্ন পর্যায়ে কার্যক্রম ও কমিটি রয়েছে।
গোলাম পরওয়ারের ভাষ্য অনুযায়ী, দলটির দুটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক ফোরাম কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ ও কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরায় যথাক্রমে ২১ ও ১২২ জন নারী সদস্য রয়েছেন। এ ছাড়া জামায়াতের রুকনদের (সদস্য) প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী। টিআইবির মতো দায়িত্বশীল সংস্থার কাছ থেকে অসত্য তথ্যনির্ভর প্রতিবেদন প্রকাশকে তিনি অনাকাঙ্ক্ষিত ও দায়িত্বহীনতা বলে মন্তব্য করেন।
জবাবে টিআইবি জানায়, তাদের গবেষণায় কোনো দলের জাতীয় বা কেন্দ্রীয় কাউন্সিল, সম্মেলন কিংবা মজলিশে শুরায় কতজন নারী সদস্য রয়েছেন, তা বিশ্লেষণ করা হয়নি। বরং কেন্দ্রীয় বা জাতীয় নির্বাহী কমিটি কিংবা পরিষদে নারীদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়েছে। ফলে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের দেওয়া তথ্য গবেষণার সঙ্গে প্রাসঙ্গিক নয়।
সংস্থাটির দাবি, জামায়াতের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত ২০২৩-২৫ মেয়াদের ১৯ সদস্যের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদে কোনো নারী সদস্য নেই। টিআইবি এটিকে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) সংশ্লিষ্ট বিধানের লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে।
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২-এর ৯০খ (১)(খ)(আ) ধারা অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সব পর্যায়ের কমিটিতে নারীদের জন্য ন্যূনতম ৩৩ শতাংশ পদ সংরক্ষণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হবে। ২০৩০ সালের মধ্যে পর্যায়ক্রমে এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা রয়েছে। টিআইবির গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর কেন্দ্রীয় কমিটিতে নারীর প্রতিনিধিত্বের ক্ষেত্রে এ বিধান বাস্তবায়নে ব্যাপক ঘাটতির চিত্র উঠে এসেছে।
৪৩ শতাংশ নারী রুকন, নির্বাচনে প্রার্থী ছিলেন না কেউ
টিআইবির গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী কোনো আসনেই নারী প্রার্থী মনোনয়ন দেয়নি। অথচ দলটির দাবি অনুযায়ী, তাদের রুকনদের প্রায় ৪৩ শতাংশ নারী। নারী সদস্যের এই অনুপাত থাকার পরও নির্বাচনে কোনো নারীকে মনোনয়ন না দেওয়ার বিষয়ে গোলাম পরওয়ারের বিবৃতিতে কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে টিআইবি।
এ ছাড়া জামায়াতের গঠনতন্ত্রের কয়েকটি ধারার সঙ্গে বাংলাদেশের সংবিধানের বিভিন্ন নীতির সাংঘর্ষিক অবস্থান রয়েছে বলেও মনে করে সংস্থাটি। টিআইবির ভাষ্য, গঠনতন্ত্রে ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে সমাজ গঠন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক হিসেবে স্বীকার না করা এবং সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান ছাড়া অন্য নিয়মনীতি ও পন্থা প্রত্যাখ্যানের কথা বলা হয়েছে।
গঠনতন্ত্রে ইসলামি আকিদাপরিপন্থী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মসূচির সঙ্গে একমত হওয়ার শর্তে অমুসলিম নাগরিকদের সদস্য বা সহযোগী সদস্য করার বিধান এবং মুসলিম ও অমুসলিম নাগরিকদের সদস্যপদের ক্ষেত্রে পৃথক শর্তের কথাও উল্লেখ রয়েছে।
টিআইবির মতে, নারী কর্মীদের জন্য পৃথক বিভাগ বা কমিটি গঠন এবং আলাদা কার্যক্রম পরিচালনার বিধানসহ এসব বিষয় সংবিধানে বর্ণিত জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা, ধর্মনিরপেক্ষতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম ও লিঙ্গের ভিত্তিতে বৈষম্য না করার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
গবেষণার তথ্যকে ‘অসত্য’ বা ‘বিভ্রান্তিমূলক’ বলার সুযোগ নেই উল্লেখ করে টিআইবি বলেছে, গবেষণার মূল বিষয় থেকে সরে গিয়ে অপ্রাসঙ্গিক তথ্য ব্যবহারের মাধ্যমে জামায়াত তাদের প্রকৃত রাজনৈতিক চর্চাকে আড়াল করার চেষ্টা করছে।
বিবৃতিতে জামায়াতে ইসলামীসহ সব রাজনৈতিক দলকে গবেষণা প্রতিবেদনের ফলাফল গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সুপারিশ অনুযায়ী প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার কার্যক্রম গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি।